রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ চারটি জীবনদর্শনের—<i>মানবতাবাদ, নিঃসঙ্গতা, ভক্তি ও বিবে</i>ক—মধ্যে সংঘর্ষ ও সংলাপের এক সূক্ষ্ম মঞ্চ। প্রতিটি দর্শন এক একটি চরিত্রের অন্তর্জগতে বিকশিত হয়ে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় আত্মজিজ্ঞাসার গভীর স্রোতে। এই উপন্যাস শুধু কাহিনি নয়—একটি দার্শনিক অন্বেষণ, যেখানে প্রেম, ধর্ম ও জীবনের মানে ক্রমশ ধূসর হয়ে ওঠে, আবার সেখানেই নিহিত থাকে জ্যোতির আভাস।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) একজন বিশ্ববরেণ্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সুরকার ও শিক্ষাবিদ। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হিসেবে তিনি কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তিনিই ছিলেন প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। তার রচিত গান রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে গীতাঞ্জলি, ঘরে-বাইরে, গোরা, চোখের বালি ও ডাকঘর।
এই ফিল্টারে কোনো রিভিউ পাওয়া যায়নি।
উপন্যাসের কাহিনি চার পর্ব বা চার চরিত্রে বিভক্ত। জ্যাঠামশাই, শচীশ, দামিনী এবং শ্রীবিলাস। শ্রীবিলাসের বয়ানে গল্পটি আবর্তিত হয়। আস্তিকতা ও নাস্তিকতা, ধর্মীয় উন্মাদনা ও বৈরাগ্য—এই দুই চরম ভাবনার মধ্য দিয়ে শচীশের সত্যানুসন্ধানের যাত্রা। অন্যদিকে জীবন্ত ও আবেগমুখী বিধবা নারী দামিনী, যে আধ্যাত্মিকতার চেয়ে রক্ত-মাংসের বাস্তব জীবনকে প্রাধান্য দেয়। শেষ পর্যন্ত শ্রীবিলাসের প্রতি দামিনীর নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। রবীন্দ্রনাথের গদ্যভঙ্গির তীক্ষ্ণতা ও নাট্যধর্মিতা এ উপন্যাসে স্পষ্ট। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা এড়িয়ে সংক্ষেপিত ও সংহত বাক্যে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব রূপায়িত হয়েছে। রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপন্যাসটির মূল শক্তি। আয়তনে ছোট পরিসরের হলেও উপন্যাসের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তথা জটিলাবর্ত চরিত্র, জীবনের গভীর অনুধাবন ও মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ, তার সবই এতে বিদ্যমান। চতুরঙ্গের চার পর্ব যেন চতুরঙ্গ বা দাবার চার ঘুঁটি বা জীবনের চার রূপ। প্রথাগত রোমান্স পেরিয়ে মানবাত্মার অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের জটিলতাকে উন্মোচন করায় ‘চতুরঙ্গ’ বাংলা সাহিত্যে একটি সার্থক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল সামাজিক বা ধর্মীয় রীতির গল্প বলেননি; বরং ঈশ্বরভাবনা, ব্যাকুল প্রেম ও অস্তিত্বের সংকটের টানাপোড়েনে মানব মানসের যে সূক্ষ্ম রূপান্তর ঘটে, তাকেই নিখুঁত ও সংহত গদ্যে কালজয়ী রূপ দিয়েছেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘চতুরঙ্গ’ মানবজীবনের নানা রূপ ও জটিল ভাবনার সূক্ষ্ম বিন্যাস। জ্যাঠামশাই জগমোহনের যুক্তিবাদী মানবতাবাদ, শচীশের তীব্র আত্মিক ব্যাকুলতা ও দার্শনিক অন্বেষণ, দামিনীর প্রাণবন্ত ও বাস্তবমুখী নারীসত্তা এবং শ্রীবিলাসের সংযত আত্মত্যাগ—এই চার চরিত্রের মাধ্যমে উপন্যাসের চারটি অধ্যায় ফুটে উঠেছে। এখানে যুক্তি, ভক্তি, প্রেম ও বাস্তবতার টানাপোড়েনে জীবনদর্শনের এক গভীর দ্বন্দ্বে পাঠক উপনীত হয়। ক্ষুদ্র অবয়বের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ জীবনের পরম সত্য, নিভৃত আকাঙ্ক্ষা ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসাকে অসাধারণ প্রাঞ্জলতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক ও ভাবগম্ভীর রচনার এক কালজয়ী শিল্পকর্ম এটি।
বইটি প্রকাশিত/স্টকে এলে আপনাকে ইমেইলে জানিয়ে দেব। নিচে আপনার ইমেইল দিন।