একজন গুপ্তচর মারা গেছে। আর সেই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছে এক অমর কিংবদন্তির।<br>প্রায়ই বলা হয়, সমুদ্র কখনো তার গোপন রহস্য প্রকাশ করে না। কিন্তু এবার সে সত্য লুকিয়ে রাখতে পারেনি। ফরাসি রিভিয়েরার নীল জলে ভেসে উঠেছিল এক ব্রিটিশ গুপ্তচরের নিথর দেহ। তার শরীরে ছিল তিনটি গুলির চিহ্ন—যেন মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের সাক্ষ্য। এক অজ্ঞাত ঘাতক শেষ করে দিয়েছিল পুরোনো ০০৭-এর যাত্রা। কিন্তু সময় কখনো থেমে থাকে না। পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে, শুরু হয় নতুন এক যুগের।<br>সংগঠিত অপরাধের অন্ধকার জগতে তখন প্রয়োজন এক নতুন অস্ত্রের। আর সেই সময়েই আলোচনায় আসেন জেমস বন্ড।<br>সত্য উদ্ঘাটনের জন্য বন্ড প্রবেশ করেন এক ঝলমলে জগতে—যেখানে ফরাসি রিভিয়েরার আভিজাত্য, দুরন্ত গতির স্পোর্টস কার, বিলাসবহুল ক্যাসিনো আর দৃষ্টিনন্দন ইয়টের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দুর্নীতিগ্রস্ত অপরাধজগত—এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জাল, যা যেকোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে প্রস্তুত।<br>এবার বন্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে হত্যার অনুমতিপ্রাপ্ত সেই বিশেষ দায়িত্ব—“লাইসেন্স টু কিল”—বহন করার যোগ্য তিনি। তাকে খুঁজে বের করতে হবে অপরাধীদের, উন্মোচন করতে হবে তাদের ভয়াবহ পরিকল্পনা। নইলে পরবর্তী গুলিটিই হয়তো ছুটে আসবে তার দিকে। কারণ সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না।<br>এটি ফরাসি রিভিয়েরার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্মম অপরাধজগতের গল্প—এক এমন পৃথিবীর গল্প, যেখানে ক্ষমতার জন্য লড়াই চলে প্রতিটি মুহূর্তে। এটি এক কিংবদন্তির জন্মকাহিনি।<br>একজন মানুষকে শুধু তার রক্ত-মাংসের শরীর দিয়ে মনে রাখা হয় না; তাকে অমর করে তোলে তার কাজ, তার সাহস এবং তার রেখে যাওয়া চিহ্ন।<br>ফরএভার অ্যান্ড আ ডে হলো জেমস বন্ডের অমরত্বের পথে প্রথম পদক্ষেপের গল্প—ধুলো, বিপদ আর মৃত্যুর ছায়ায় ঘেরা এক জগতের কাহিনি। ক্যাসিনো রয়্যালের প্রিক্যুয়েল এই রোমাঞ্চকর উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে সময়ের কঠিন বাস্তবতায় গড়ে ওঠা এক সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক অদম্য যোদ্ধায়।
অ্যান্টনি হরোউইৎজ (জন্ম ১৯৫৫) একজন খ্যাতিমান ব্রিটিশ লেখক ও চিত্রনাট্যকার। তিনি রহস্য, থ্রিলার ও কিশোর সাহিত্য রচনার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তার জনপ্রিয় Alex Rider সিরিজ তরুণ পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়া তিনি শার্লক হোমস ও জেমস বন্ডের মতো বিখ্যাত চরিত্রকে কেন্দ্র করে নতুন উপন্যাস লিখে বিশেষ প্রশংসা পেয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে দ্য ওয়ার্ড ইজ মার্ডার, ম্যাগপাই মার্ডারস, দ্য সেন্টেন্স ইজ ডেথ, আ লাইন টু কিল এবং উইথ আ মাইন্ড টু কিল। টেলিভিশনের জন্যও তিনি বহু সফল চিত্রনাট্য লিখেছেন।
সমকালীন সেরা তরুণ অনুবাদকদের মধ্যে রুদ্র কায়সার অন্যতম। শব্দের কারুকাজ আর মূল ভাষার ভাবের প্রতি একনিষ্ঠতা তার অনুবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ আর বিশ্বসাহিত্যের বিচিত্র স্বাদ বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাড়না থেকেই তার অনুবাদ যাত্রার শুরু। অযথা আক্ষরিক অনুবাদের বেড়াজালে আটকে না থেকে মূল লেখকের দর্শন ও প্রেক্ষাপটকে অক্ষুণ্ণ রেখে সহজবোধ্য গদ্যে গল্প বলার এক সহজাত দক্ষতা তার রয়েছে। কেবল ভাষাান্তর নয়, বরং একটি সংস্কৃতির নির্যাসকে অন্য ভাষায় জীবন্ত করে তোলাই তার মূল লক্ষ্য। দেশি-বিদেশি সমকালীন সাহিত্য, থ্রিলার এবং জীবনঘনিষ্ঠ ধ্রুপদী রচনার প্রতি রুদ্র কায়সারের বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি মননশীল পাঠ ও সৃজনশীল কাজের সাথে সম্পৃক্ত। রুদ্র কায়সার বিশ্বাস করেন, অনুবাদ হলো দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এক পলিমাটির সেতু, যা বিশ্বসাহিত্যকে স্থানীয় পাঠকদের হৃদয়ের খুব কাছে নিয়ে আসে। পাঠকের ভালোবাসাই তার নিরন্তর পথচলার প্রেরণা। প্রথম অনুবাদ আগাথা ক্রিস্টির ‘মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া’।
এই ফিল্টারে কোনো রিভিউ পাওয়া যায়নি।
একজন কিংবদন্তির জন্মের গল্প: ‘ফরএভার অ্যান্ড আ ডে’ জেমস বন্ডকে আমরা সাধারণত চিনি একজন পরিণত, আত্মবিশ্বাসী এবং ভয়ংকর দক্ষ গুপ্তচর হিসেবে। হাতে মার্টিনি, ঠোঁটে নির্লিপ্ত হাসি, আর সামনে যত বড় বিপদই থাকুক, বন্ড যেন সবসময় এক ধাপ এগিয়ে। কিন্তু সেই বন্ড যদি তখনও ‘বন্ড’ হয়ে না ওঠেন? অ্যান্টনি হরোউইৎজের ‘ফরএভার অ্যান্ড আ ডে’ ঠিক সেই গল্পটাই বলে। Casino Royale-এরও আগে, যখন জেমস বন্ড সদ্য Double-O সেকশনে জায়গা করে নিয়েছেন। আগের 007 খুন হয়েছেন মার্সেইয়ের সমুদ্রে। তার জায়গায় দায়িত্ব পান এক তরুণ, অনভিজ্ঞ কিন্তু অসম্ভব দৃঢ়চেতা এজেন্ট জেমস বন্ড। বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক আমার কাছে বন্ডের এই অপরিণত রূপ। এখানে সে ভুল করে। ঝুঁকি নেয়। কখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। কিন্তু প্রতিটি বিপদ তাকে একটু একটু করে সেই জেমস বন্ডে পরিণত করে, যাকে আমরা পরে চিনব। আর সেই যাত্রার পটভূমি ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা। দুর্দান্ত গাড়ি, বিলাসবহুল হোটেল, ক্যাসিনো, ইয়ট, সুন্দরী নারী, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, মোট কথা বন্ডের জগতের পরিচিত সব উপকরণই আছে। কিন্তু এগুলোকে শুধু সাজসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি হরোউইৎজ। ধীরে ধীরে গল্পের ভেতর ঢুকে যায় হত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধ আর ক্ষমতার ভয়ংকর খেলা। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, হরোউইৎজ বন্ডকে আধুনিক করে নতুন করে লেখার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি ফিরে গেছেন ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সময়ের আবহে। ভাষা, পরিবেশ, চরিত্রের আচরণ, সবকিছুতেই আছে পুরোনো দিনের স্পাই-থ্রিলারের সেই স্বাদ। তবে ‘ফরএভার অ্যান্ড আ ডে’ শুধু অ্যাকশন আর গুপ্তচরবৃত্তির গল্প নয়। এর ভেতরে আছে একজন কিংবদন্তি চরিত্র কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় তৈরি করে তার গল্প। শেষ পর্যন্ত মনে হয় আমরা আসলে জেমস বন্ডের একটি মিশন পড়ছি না; আমরা দেখছি জেমস বন্ড হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলো। আর এ কারণেই বইটি শুধু বন্ডভক্তদের জন্য নয়। যারা স্পাই থ্রিলার, ষড়যন্ত্র, রহস্য, অ্যাকশন আর পুরোনো দিনের অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পছন্দ করেন, তাদের জন্যও এটি দারুণ একটি পাঠ। রুদ্র কায়সার ও শোভন নবীর অনুবাদে, বোহো থেকে প্রকাশিত ‘ফরএভার অ্যান্ড আ ডে’ একজন কিংবদন্তির প্রথম অধ্যায়ের গল্প। অনুবাদ ভালো লেগেছে। বানান দুই একটা ভুল ছিল, তবে পড়ার ক্ষেত্রে খুব একটা বিপত্তির জন্ম দেয় না। তাই এই ব্যাপারটা উল্লেখ করার মতোও ছিল না তেমন। তবে উপন্যাসটা উপভোগ্য ছিল স্বীকার করতেই হবে।
বইটি প্রকাশিত/স্টকে এলে আপনাকে ইমেইলে জানিয়ে দেব। নিচে আপনার ইমেইল দিন।